16.8 C
New York
Tuesday, November 10, 2020

মধ্যরাতের চরিত্র

রাতের শহরে একা একা বাইক নিয়ে ঘুরতে বের হওয়াটা আমার অনেকদিনের নেশা… কিছু ব্যক্তিগত কারণে প্রায় কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেলো রাতের শহর দেখি না… তাই ঠিক করলাম আজ রাতেই ঘুরতে বের হবো… যেহেতু কয়েকদিন ধরে একটু মানসিক চাপে আছি… আমার রাতের শহর দেখার একটা নির্দিষ্ট সময় আছে… যথারীতি একই সময়ে বাসা থেকে দাওয়াতের কথা বলে বের হইলাম… গ্যারেজ থেকে বাইক বের করে বসে আছি… কোথায় যাবো প্রথমে সেটাই ভাবছিলাম… ভাবতে ভাবতে ৩টা সিগারেট শেষ হয়ে গেলো… কিন্তু ভেবে কোনো কিছু খুজে পেলাম না… তাই ঠিক করলাম আজ উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরবো… হাতের সিগারেটে শেষ একটা টান দিয়ে রওনা দিলাম… রাতের শহরে মানুষ তুলনামূলক অনেক কম থাকে… কিন্তু হাজারও গল্প ছড়িয়ে আছে… আমার রাতের শহর দেখা মানেই সেই হাজার গল্পের মধ্যে একটা গল্প জানা… আজও তার ব্যতিক্রম না… স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি গতিতে চলমান বাইকে বসে চারদিকে তাকিয়ে গল্প খুজছি… প্রায় ২ ঘন্টার মতো ঘুরলাম, কিন্তু একটা গল্প বা চরিত্রও দেখলাম না… খুব বেশি বিরক্ত এখন আমি… ঠিক করলাম এক জায়গায় দাঁড়াবো… সিগারেট খাওয়া দরকার… রক্তটা এখন নিকোটিন খুজছে খুব বেশি পরিমাণে… নির্জন এক রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে গেলাম… বাইক থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখেই ফুটপাথে বসে রক্তে নিকোটিনের যোগান দিচ্ছিলাম… আজকের রাতে কোনো গল্প পাবো না ভেবেই মনটা আরো বেশি খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো… বসে বসে আরো ৩টা সিগারেট শেষ করে আবার গল্প খোঁজার জন্য উঠে দাড়াইলাম… যখনই বাইকে বসতে যাবো তখনই পিছন থেকে কেউ একজন বলে উঠলো,

– ভাই, একটা সিগারেট দেয়া যাবে…?

একটু অবাক আর বিরক্ত হয়ে পিছনে তাকালাম… ছেলেটা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,

– আসলে আশেপাশে সিগারেটের দোকান পাচ্ছি না তো, তাই আপনার কাছে আসলাম… আমি টাকা দিয়েই আপনার থেকে সিগারেট কিনবো…

কথাটা শুনে কেনো জানি আরেকবার ছেলেটার চেহারা দেখলাম… দেখে ভদ্র ঘরের ছেলেই মনে হচ্ছে… একটু বিধস্ত লাগছে দেখতে… বললাম,

– টাকা লাগবে না… আপনি এতোক্ষন কোথায় ছিলেন…? আপনাকে তো আশেপাশে দেখি নাই…

– ওইযে ওইখানে… বলেই একটা অন্ধকার জায়গা দেখালো… আমি জায়গাটা দেখে সিগারেটটা ছেলেটার হাতে দিয়ে বললাম,

– আসি ভাই…

একটা মুচকি হাসি দিয়ে কৃতজ্ঞতা জানালো… আমি রওনা দিলাম… ১০/১৫ মিনিট বাইক চালানোর পর হটাৎ ছেলেটার চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো… কেনো জানি মনে হলো আমার আজকে রাতের শহরের চরিত্রটা এই ছেলেটাই… ছেলেটার গল্প শুনতে ইচ্ছে হলো… এতো রাতে ওইরকম একটা ছেলে এমন একটা জায়গায় একা থাকার কথা না… গল্প তো একটা অবশ্যই আছে… গল্প শোনার লোভে ইউ-টার্ণ নিয়ে সেই জায়গায় ফিরে আসলাম… দেখি পুরো ফাকা… মনে পড়লো ছেলেটার দেখানো জায়গার কথা… বাইকটা নিয়ে সেদিকেই গেলাম… একটা যাত্রী-ছাউনি… ল্যাম্পপোস্ট থেকে মোটামুটি দূরেই, তাই আলো পৌঁছায় না… ছেলেটা মাথা নিচু করে বসে আছে… বাইকের শব্দ শুনেও মাথা উঠালো না… আমি বাইক থেকে নেমে ছেলেটার পাশে গিয়ে বসলাম… সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট নিয়ে জ্বালালাম… আরেকটা সিগারেট ছেলেটার দিকে এগিয়ে দিলাম… ছেলেটা মাথা না উঠিয়েই হেসে বললো,

– ফিরে আসলেন যে…?

– ভাবলাম আমিও একা, আর আপনিও একা… তাই গল্প করতে চলে এলাম…

– আপনি তো গল্প শুনতে আসছেন… তাই না…? রাতের শহরের গল্প খুজেন আপনি…
খুব বেশি পরিমাণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম… ছেলেটা হেসে উঠলো… আমি গিজ্ঞাসা করলাম,

– আপনি কি করে জানেন…??

– আপনি যখন লাইটের আলোতে বসে সিগারেট খাচ্ছিলেন আর এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিলেন তখনই বুঝেছি…

– বাহ, আপনার তো পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ভালো… দূর থেকে দেখেই বুঝে গেলেন…

– আসলে আপনার মতো মানুষ সবসময় দেখা যায় না… তাই চিনতে পারছি…

– আপনার নাম…??

– মৃত মানুষের নাম হয় না…

কথাটা শুনে হেসে উঠলাম… আমার হাসি শুনে এই প্রথম ছেলেটা মাথা তুলে তাকালো… বললো,

– হাসছেন যে…??

– হাসবো না তো কি করবো… জলজ্যান্ত মানুষ আপনি, আর মুখে বলছেন মৃত… বলেই হেসে উঠলাম আবার… এইবার ছেলেটাও হেসে উঠলো… বললো,

– আমার গল্প বলা শেষ হলে আপনিও বুঝতে পারবেন যে আমি মৃত…

– আচ্ছা বলেন শুনি…

– সিগারেট দেয়া যাবে আরেকটা…???

সিগারেটটা হাতে নিয়ে জ্বালানোর পর কয়েকটা লম্বা টান দিয়ে একরাশ ধোয়া ছাড়লো… খেয়াল করে দেখলাম পরিবেশটা কেমন যেনো বদলে গেলো মনে হচ্ছে… ছেলেটা বলতে শুরু করো,

– আমার গল্পটা একদম অন্যরকম… বাবা মায়ের খুব আদরের একমাত্র ছেলে আমি… ছোটবেলা থেকেই খুব বেশি পরিমাণ আদর পেয়ে বড় হয়েছি… খুব লক্ষী ছেলে ছিলাম… দশম শ্রেণী পর্যন্ত আম্মুই আমাকে নিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করতো… কলেজে উঠার পর একা একা চলাফেরা শুরু হলো… বন্ধু-বান্ধব বাড়তে লাগলো… মেয়েদের থেকে দূরে থাকা আমার ছোটবেলার অভ্যাস… ভালোই ছিলাম বন্ধু-বান্ধব নিয়ে… ঘুরাঘুরি, আড্ডা, ফাইজলামি, মাঝে মাঝে ২/১টা সিগারেট খাওয়া এই ছিলো আমার জীবন…

এইটুকু বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ছেলেটা… সাথে সাথেই খেয়াল হলো আমার হাতের সিগারেটটা বাতাসেই পুড়ে গেছে… দেখলাম ছেলেটার হাতেও সিগারেট নাই… জিজ্ঞাসা করলাম,

– আরেকটা নিবেন সিগারেট…??

– না, পরে…

– আচ্ছা তারপর বলেন…

– আপনি সিগারেট জ্বালান, তারপর বলছি…

আমার সিগারেট জ্বালানোর পর ছেলেটা বলতে শুরু করলো,

– কলেজ জীবনটা খুব ভালোভাবেই কাটাইলাম… এরপর আসলো ভার্সিটি জীবন… আল্লাহর রহমতে ভালো একটা ভার্সিটিতেই ভর্তি হইলাম… সবকিছু ঠিকই চলছিলো… হটাৎ দেখা হলো নীলার সাথে… আমার আরেক বন্ধুর মাধ্যমেই ওর সাথে পরিচয়… প্রথম দেখাতেই কেনো জানি ওকে খুব ভালো লেগে গেছিলো… আস্তে আস্তে ওর সাথে কথা বলা শুরু হলো… কথা বলতে বলতে কখন যে ওর প্রতি দূর্বল হয়ে গেলাম নিজেও জানি না… অনেকদিন থেকেই ওকে সব বলবো ভাবছিলাম… কিন্তু সাহস করতে পারছিলাম না… একদিন সাহস করে ওকে বললাম একা দেখা করবো… ধানমন্ডি লেকে আসতে বললাম… সেদিন খুব কষ্টে ওকে সবকিছু বলে দিয়েছিলাম… ভেবেছিলাম হয়তো এখানেই সব শেষ… কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে নীলা রাজি হয়ে গেলো… এরপর আমাদের জীবনটা খুব ভালোই চলছিলো… তিনটা বছর আমরা একসাথে কাটাই… কিন্তু হটাৎ করেই একদিন নীলা বললো, আমাকে বিয়ে করবে…?? বললাম, হ্যা করবো… নীলা বললো, কালকেই আমরা বিয়ে করবো… জিজ্ঞাসা করেছিলাম কালকেই কেনো… শুধু বললো, এখন কথা বলার সময় নাই… পরদিন আমাদের ঠিক এই জায়গায় দেখা করার কথা ছিলো…

লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,

– একটা সিগারেট দিবেন…??

গল্প শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলাম… ছেলেটার স্পর্শে বাস্তবে ফিরে এলাম… ছেলেটার হাত অস্বাভাবিক পরিমাণ ঠান্ডা… সিগারেট দিতেই সিগারেটটা জ্বালিয়ে নিলো… পুরো সিগারেটটা চুপ করে টানতে থাকলো… আমিও ওর দেখাদেখি সিগারেট খেলাম… সিগারেট শেষ হতেই জিজ্ঞাসা করলাম,

– এরপর কি হলো…?? বিয়ে করেননি…??

– করেছিলাম…

– দেখা করার পর থেকে বলবেন…??

– হুম… পরদিন ঠিক সময়ের আগেই আমি এইখানে এসে অপেক্ষা করছিলাম… সব ব্যবস্থা করে আসছিলাম… ঠিক সময়েই নীলা এলো… এরপর আমরা কাজী অফিসে যেয়ে বিয়ে করলাম… বিয়ে শেষ হলে ও বললো ওর কিছু কাজ আছে… সেগুলো শেষ করতে যাবে এখন… আমাকে এই স্টপেজেই অপেক্ষা করতে বললো… যাওয়ার আগে শুধু জানতে চাইলো এখন কি করবো… বললাম তোমার অপেক্ষা… হেসে চলে গেলো… তারপর থেকে আমি অপেক্ষাই করছি… আজ প্রায় ৫ বছর হয়ে গেলো, নীলা এখনো আসে নাই…

গল্পটা শুনতে শুনতে কোথায় যেনো হারিয়ে গিয়েছিলাম… হটাৎ কানে আজানের শব্দ এলো… আর পাশ থেকে কেউ একজন বলে উঠলো,

-ভাই, কিছু হয়েছে…??

তাকিয়ে দেখি মধ্যবয়স্ক একজন লোক… পুলিশের ইউনিফর্ম পড়া… একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম,

– না, কিছু হয় নাই… আমরা একটু গল্প করছিলাম আর কি…

– আমরা মানে…??? একটু অবাক হয়েই বললেন ভদ্রলোক…

– আমরা মানে এইযে উনি………… বলে পাশের ছেলেটার দিকে ইঙ্গিত করতে যেয়ে দেখি কেউ নাই… অবাক হয়ে উঠে দাড়ালাম… ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম,

– আপনি আমাকে ডাকার আগে আমার পাশে একজন ছিলো… উনি কোথায়…??

– আপনার সাথে তো কেউ ছিলো না… আমি তো গত ২ ঘন্টা যাবৎ আপনাকে দেখছি একা বসে আছেন… আমি তো গাড়িতে বসে আপনাকে খেয়াল করছিলাম…

– গাড়ি…??

জিজ্ঞাসা করতেই অফিসার তাদের টহল গাড়িটা দেখালো… খুবই আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলাম… কারণ আমি এই রাস্তায় আসার পর ওই ছেলেটা ছাড়া আর কোনোকিছুই ছিলো না… অফিসারের দিকে তাকিয়ে রইলাম… উনি কি বুঝলেন জানি না, বললেন,

– বাসায় যান… আপনার বিশ্রাম দরকার…

জ্বি বলে বাইক স্টার্ট দিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম… রাতের ঘটনাটা এখনো মাথায় ঢুকছে না… নাহ… এখন আর ভাববো না… রাস্তায় সাইডে দাঁড়িয়ে প্যাকেটে থাকা শেষ সিগারেটটা জ্বালাতে যেয়ে দেখি আমার সিগারেটের প্যাকেটের সবগুলো সিগারেটই রয়ে গেছে… মাথায় ঢুকছে না গতকাল রাতে আমার সাথে কি হয়েছিলো…

Koushik Ahmed
I’m just human, I have weakness, I make mistakes and I experience sadness; But I learn from all these things to make me a better person.

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়

তোমাকেই খুঁজি

বড় বড় ঢেউ গুনছো তুমি লঞ্চের ছাঁদে বসে, অর্ধ চাঁদের জোছনায় তুমি ভাবনায় যাচ্ছো ডুবে। ঝড়ো হাওয়ায় উড়ছে দেখো, তোমার কালো চুল। কল্পনাতে ভাবছি নাকি ভুল? একি! তোমার হাতে পদ্ম ফুল, পেলে...

নিস্তব্ধতার গন্ডিজাল

ঝড়ের চঞ্চল হাওয়া বয়ে যায় আমার নীড়ের পাশে, দুটি চোখ মেলে তাকিয়ে থাকি ওই নীল আকাশে। মনটা হয়ে যায় তখন, আনমনা আর উদাসিন। কালো মেঘেরা বলে তাদের গল্প কথা, নীড়হীন...

হয়তো

হয়তো... কখনো সকালের রোদ্দুর হয়ে তোমার ঘুম ভাঙ্গাবো... তোমার চায়ের কাপে ছোট্ট একটা পিপড়ে হয়ে ভেসে থাকবো... কখনো লাল মেহেদী হয়ে তোমার হাতে আকা থাকবো... কিংবা কখনো চশমার...

স্বপ্ন

স্বপ্ন যে এতোটা বাস্তবিক আর স্পর্শকাতর অনুভুতি দিতে পারে সেই ব্যাপারটা কিছুদিন আগেও আমার অজানা ছিলো... জ্ঞান হবার পর থেকে আজ অব্দি ভালো-খারাপ অনেক...